পরাবাস্তব — সৌম্য ঘোষ

পরাবাস্তবতা শিল্প-সাহিত্যের এক শক্তিশালী ধারা। বাস্তবতা সবার চোখে একইরকম দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে হাজির হয় না। বাস্তবতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা আরেক বাস্তবতাকেই হয়তো পরাবাস্তবতা বলা হয়ে থাকে। পরাবাস্তবতা এমনই এক বাস্তবতা, যে বাস্তবতার সঙ্গে চাক্ষুষ বাস্তবতার কোনো মিলই নেই। আবার ক্ষেত্রবিশেষে মিল থাকতেও পারে। মনোবিজ্ঞান বলে, মানুষের মনের দুটি ভাগ আছে- চেতন আর অবচেতন। চেতন মন যে ব্যাপারটা দূরে সরিয়ে রাখতে চায়, অবচেতন মন যেন তাকে কাছে টেনে নেয়। আবার, এর উল্টোটাও ঘটতে পারে। অবচেতন মনের কাজকর্ম যখন রূপকের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়, তখন তাকে পরাবাস্তববাদ বলে।

১৯১৭ সালে ফরাসি লেখক গিয়োম এপোলেনেয়ার সর্বপ্রথম ‘স্যুরিয়ালিজম’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। তবে এই পরাবাস্তববাদ আন্দোলনের সূত্রপাতটা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণেই ঘটেছিল। কেননা, তখনকার শিল্পী সমাজ মানুষের অতিরিক্ত চিন্তার ফসল হিসেবে যুদ্ধকে দায়ী করেছিল। শিল্পীরা তাই অর্থহীন আঁকাআঁকি আর যুক্তিহীন লেখালেখি করে এক স্বতন্ত্র ধারা তৈরি করলেন; যা প্রচলিত ধারার বিপরীত বা অ্যান্টিআর্ট। ইতিহাসে এই আন্দোলন ডাডা মুভমেন্ট বা ডাডা আন্দোলন নামে অভিহিত আর এই আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী আন্দ্রে ব্রেটন। পরে এই আন্দোলনের সঙ্গে মার্কসবাদ জড়িয়ে গেলে আন্দোলন আরো তীব্র হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯২৪ সালে ব্রেটন দ্য স্যুরিয়াল ম্যানোফেস্ট গ্রন্থ প্রকাশ করে পরাবাস্তবতাকে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করেন।

পরাবাস্তবতার অসংখ্য উদাহরণ আমরা আমাদের জীবনযাপনের মাঝেই দেখতে পাই। লেড জ্যাপলিনের ‘স্টেয়ারওয়ে টু হেভেন’ গানটা শুনে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে স্বর্গীয় এক আবেশে।

বাংলা গানে হেমন্ত বা অন্য শিল্পীর গানে কি একটা রমনীয় জগত সৃষ্টি হয় না মনে ভেতর ? কিম্বা বাংলা সাহিত্যে ? বিভূতিভূষণের উপন্যাস, জীবনানন্দ, শক্তি প্রভৃতির কবিতা কি আপনাকে এক ভালোলাগা জগতের আবেশে মথিত করেনা ? ছাত্রজীবনে একবার “তিতাস একটি নদীর নাম” পড়তে পড়তে ভুলে গিয়েছিলাম আমি কোথায় আছি !

হাজার বছর ধরে পথ হেঁটে এক রমণীকে খোঁজার কাহিনী শুনতে পাই আমরা জীবনানন্দের কবিতায়। স্পেনের কবি লোরকার সাথে ঘুমাতে চাই আপেলের মতো নিশ্চিন্ত এক ঘুম। শহীদুল জহিরের গল্পের মতো দুপুরবেলার কাকশূন্য এক শহর দেখতে ইচ্ছে করে আমাদের। হুমায়ূন আহমেদের গল্প পড়ে পাঠকের ইচ্ছা জাগে, একই আকাশে দুটো সূর্য কিংবা চাঁদ দেখার। হারুকি মুরাকামির গল্পে আমরা মানুষের মতো কথাবলা এক ব্যাঙের খোঁজ পাই।

অথবা জীবনের চরম অসহায়ত্ব আর অসারতাকে বুঝাতে জার্মানির কাফকার গল্পে এক সেলসম্যানকে দেখি, সকালে উঠেই যে নিজেকে এক গুবরেপোকায় আবিষ্কার করে। স্টিফেন কিংয়ের গল্প অবলম্বনে নির্মিত বিখ্যাত সিনেমা ‘দ্য শাইনিং’-এর থিয়েটারের সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্যে হারিয়ে যাই আমরা এখনো, যখন আতঙ্ক এসে ভর করে আমাদের কাঁধে।

এই পরাবাস্তব সাহিত্যের এক উজ্জ্বল ক্ষেত্র ।।

লেখক : — অধ্যাপক সৌম্য ঘোষ। চুঁচুড়া।হুগলী।

#storyandarticle

--

--

বাংলা ভাষার সাহিত্য পত্রিকা । যে কোনো সময় লেখা পোস্ট করা যায় । ফেসবুক https://www.facebook.com/storyandarticle পত্রিকার লিঙ্ক https://storyandarticle.com

Love podcasts or audiobooks? Learn on the go with our new app.

Get the Medium app

A button that says 'Download on the App Store', and if clicked it will lead you to the iOS App store
A button that says 'Get it on, Google Play', and if clicked it will lead you to the Google Play store
Story and Article

Story and Article

বাংলা ভাষার সাহিত্য পত্রিকা । যে কোনো সময় লেখা পোস্ট করা যায় । ফেসবুক https://www.facebook.com/storyandarticle পত্রিকার লিঙ্ক https://storyandarticle.com