কবি মধুমঙ্গল বিশ্বাস এর জন্মদিনে তৈমুর খানের শ্রদ্ধা নিবেদন

আজ মধুমঙ্গল বিশ্বাস এর জন্মদিন

আজ ২ জনুয়ারি কবি মধুমঙ্গল বিশ্বাসের জন্মদিন। ১৯৬৪ সালের এই দিনে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন। হয়তো ঘটা করে পালিত হবে না তাঁর জন্মদিন। হয়তো অনেকেই জানবেন না। হয়তো অনেকেই খোঁজ রাখতে চান না। কিন্তু আমরা কয়জন তো জানি! মধুমঙ্গল বিশ্বাস কেমন কবি, কেমন মানুষ, কেমন সম্পাদক, কেমন বন্ধু।

কবি

তাঁর মতো খুব কম মানুষই আছেন যাঁরা নিজেকে কবি বলতে চান না। হয়তো কখনো কখনো কবিতাকর্মী হিসেবে পরিচয় দেন। বেশিরভাগ সময়েই ‘কবিতা ভালোবাসেন’ একথাই বলে থাকেন। আত্মজীবনের ঘনিষ্ঠ উত্তাপ থেকে কবিতার যেমন শব্দ খোঁজেন, তেমনি অনন্ত মানবসম্পর্কের গভীরে ডুব মারেন। খুঁজতে থাকেন কোথায় মানবিক উৎস, কোথায় জীবন চেতনার এমন সমন্তরাল বিস্তার। তিনি বিশ্বাস করেন প্রত্যেকটা মানুষের মধ্যেই শুভ চেতনা বিরাজ করে। কেউ কেউ এই শুভ চেতনার টের পায়; কেউ কেউ পায় না। যারা পায় তারাই পরিপূর্ণ মানব। যারা পায় না তারাই মানবযাত্রায় পিছিয়ে পড়ে। তাই একটি মানুষ যেমন আদিমতা নিয়ে সে মানুষ, তেমনি কল্যাণবোধ নিয়েও সে মানুষ। এই চিরন্তন মানবিক প্রজ্ঞা থেকেই মধুমঙ্গল বিশ্বাস নিজেকে বিচার করেন। অন্য মানুষদেরও বিচার করেন। দুইয়েরই সমন্তরাল প্রজ্ঞার অভিমুখ তাঁর কাব্যদর্শনের শৈল্পিক বিভাস। প্রচলিত ধর্মবোধে যে ঈশ্বরের জন্ম, সেই ঈশ্বর তাঁর কাব্যে নেই। বরং মানুষই ঈশ্বর হয়ে ওঠেন তাঁর কাব্যে। বিগত জীবনের সংগ্রামময় অধ্যায় যেমন উঠে আসে, তেমনি তা বাস্তবতার নিরিখে একটা নিজস্ব জগৎও নির্মাণ করে। যেখানে কবি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন তাঁর শব্দ নিক্ষেপণে। রাষ্ট্র-সমাজ, শোষণ-অসাম্য, অমানবিক উল্লাস, হত্যা-চক্রান্ত, সহিংসতা-পীড়ন, অমানবিক-অসহিষ্ণুতার প্রতিও কবির বিদ্রোহ লেখা হয় কবিতায়। সবকিছু মানবিক দায় থেকেই তিনি তা সম্পন্ন করেন। কখনো কখনো পর্ব ভেঙে অক্ষরবৃত্তকে গতিশীল করেন। কখনো গদ্যের ছাঁদে কবিতার লয়কে অন্তর্মুখীন অভিঘাত দান করেন। বাইরে থেকে বোঝা যায় না তার শব্দের চালে কতটা দ্রুততা আছে, কতটা স্বয়ংক্রিয়তা আছে। অথচ শব্দগুলি অনপনেয় প্রাণশক্তিতে টইটম্বুর। মধুমঙ্গল কবিতার শব্দকে যেমন হৃদয় থেকে চালিত করেন, তেমনি মস্তিষ্ক থেকেও তাতে আলো ক্ষরিত হয়। স্বাভাবিকভাবেই কবিতাগুলি ভাব সামঞ্জস্যে কিছুটা কাঠিন্য প্রকাশ করে। কিন্তু তার অন্তঃস্থলে এক সহজিয়া উচ্ছ্বাস বিরাজ করে। সেই কমনীয়তাকে স্পর্শ করতে গেলে পাঠককেও অভ্যস্ত হতে হয়। যাঁরা খুব কাছ থেকে মধুমঙ্গলকে চেনেন, তাঁরা কিছুটা হলেও এটা উপলব্ধি করতে পারেন। সাম্প্রতিকের লেখা ‘গহিন গাঙ’ কাব্যের ৩৭ নং পর্বে তিনি লিখেছেন:

“আঠারো পর্বের শেষে

মনে হতে থাকে

এত শাখা এত উপশাখা খাড়ি ও অচেনা সুর

আনন্দ অপার তবু আবিষ্কারের কত সম্ভাবনা —

এই পর্বে জ্ঞানের প্রাবল্য

আর,জীবনের প্রকৃত চরের আভা

আদি-অন্ত সংখ্যাহীন পর্যটন আমাদের”

যদিও এটি লেখা ২০১৩-র ১০-ই অক্টোবর, তবু মধুমঙ্গল বিশ্বাস দাম্পত্য জীবনেও কতটা বিজ্ঞানী এবং কতটা দার্শনিক হয়ে উঠেছিলেন এবং পাশাপাশি কতটা কবি হয়ে উঠেছিলেন তা এই অংশটিতে লক্ষ করা যায়। জীবনের পথ কখনো মসৃণ হতে পারে না। আর জীবন তো এক পর্যটন। সেই পর্যটনে যেমন আবিষ্কারের নেশা থাকে, যার জন্য বিজ্ঞানী হতে হয়; তেমনি বিজ্ঞান যখন সর্বত্র পৌঁছায় না তখন ‘জ্ঞানের প্রাবল্য’ দার্শনিক করে তোলে। তারপর দার্শনিকও আশ্রয় চায়। আর এই আশ্রয় দিতে পারে শব্দ — যেখানে কবি বলেছেন ‘জীবনের প্রকৃত চরের আভা’।

মধুমঙ্গল শুধু আবেগ তাড়িত জীবনের অন্বয়কে কবিতা করে তুলতে চাননি। তাই দার্শনিকতাও তাঁর চর্চার মধ্যে এসেছে। এখানেই হয়ে উঠেছে কবিতা এক আলোকশস্য। ফরাসি দার্শনিক, লেখক ও সাংবাদিক আলবার্ট কামু(১৯১৩-১৯৬০) এই কারণেই বলেছিলেন “There is no sun without shadow, and it is essential to know the night.”

অর্থাৎ ছায়া ছাড়া সূর্য নেই, এবং রাতকে জানা অপরিহার্য। মধুমঙ্গল এর কাছে জীবনও এরকমই। ‘প্রেমে ও পয়ারে থাকো’ কাব্যের কয়েকটা পংক্তি এরকমই:

“চেনা পথে হাঁটতে হাঁটতে ক্রমশ গহন গভীর অচেনায়।

দিক ভুলে যেতেই শুরু হচ্ছে আবিষ্কার, যাকে তুমি প্রকৃত

গমন ভেবে শ্রাবণ ও ফাল্গুন একাকার দেখে নিতে পারো।”

জীবনের প্রেম ও পয়ার কখনো ভেঙে যেতে পারে। কখনো অচেনা মনে হতে পারে। কিন্তু জীবন থামে না। এই শিল্প আর জীবন, এই কবিতা আর জীবন, এই দর্শন আর উপলব্ধি মধুমঙ্গল বিশ্বাসের কবিতায় বারবার ফিরে আসে। আশ্চর্য এক উদাসীনতায় তিনি নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখেন। সাহিত্যে কখনো তাঁর তোলপাড় নেই। চিৎকার নেই। একান্ত নিভৃতির অন্তরালে তিনি রয়ে গেলেন।

মানুষ

অত্যন্ত দরদী একটা মন দেখেছিলাম। কিন্তু অসম্ভব আত্মবিশ্বাসী মানুষ। সারাদিন কর্মশ্রান্ত, তবু কখনো বিপন্নবোধ দেখিনি। কবিতার কাছে উপেক্ষা করেছেন যাবতীয় অন্তরায়গুলি। সংবেদনশীল হৃদয় নিয়ে সাহায্য করেছেন অন্যকে। কবিতাকে কেমন করে ভালোবাসতে হয় তা তাঁর কাছেই শিখেছিলাম। কেমন করে বই প্রকাশ হবে, কে করবেন বই প্রকাশ সব ভাবনা ছিল যেন তাঁরই। লেখাপড়া করতে গিয়ে হোস্টেলে থাকি। প্রতি মাসে কে খরচ দিবে, কেমন করে চলে তার খোঁজ খবর নেবারও এবং ন্যূনতম সাহায্যটুকু পাঠানোরও দায় ছিল তাঁর। মনখারাপ করলে কাকে বলব, প্রেম করলে কাকে বলব, কলকাতা গেলে কোথায় উঠব, কীভাবে লেখাপড়া করব সবকিছুরই পরামর্শদাতা তথা আশ্রয়দাতা। ভাড়ার একটা রুমে পাশাপাশি থাকা, সারারাত কবিতা শোনা, আলোচনায় কাটিয়ে দেওয়া, তারপর বইমেলা, লিটিল ম্যাগাজিন মেলার সঙ্গী হওয়া। প্রথম কাব্যপ্রকাশ থেকে, প্রথম গদ্য লেখারও প্রেরণা পাওয়া। এরকমই মানুষ মধুমঙ্গল বিশ্বাস।

সম্পাদক

বিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময় থেকেই ‘দৌড়’ পত্রিকার জন্ম দেন। তা আজ ৩৮ বছরে পদার্পণ করল। একটা পত্রিকা ৩৮ বছর ধরে চলছে এটা কম কথা নয়। মাঝে মাঝে হয়তো প্রকাশ হতে দেরি হয়েছে, কিন্তু তবু কখনো বন্ধ হয়ে যায়নি। বেশ কিছু বিশেষ সংখ্যা ‘দৌড়’ রীতিমতো গবেষণার বিষয়। ইতিহাস ও সময়ের নিরিখে, রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন বা জনজীবনের বিপর্যয়কে সম্পাদক উপেক্ষা করতে পারেননি। বিশিষ্ট সাহিত্যিক থেকে তরুণ কবি-লেখকদের কাছ থেকে লিখিয়ে নিয়েছেন লেখাগুলি। মরিচঝাঁপি সংখ্যা, আড্ডা সংখ্যা, বিনয় মজুমদার সংখ্যা, দাম্পত্য সংখ্যা, সিঙ্গুর-নন্দিগ্রাম সংখ্যা, প্রেম সংখ্যা, গদ্য সংখ্যা, দীর্ঘ কবিতা সংখ্যা, বাংলাদেশ সংখ্যা, শূন্য দশক সংখ্যা, দশজন পছন্দের কবি সংখ্যা আরও কত সংখ্যা যে বেরিয়েছে তা মনে করতে পারি না। নবীন কবিকে সর্বদা সম্মান জানিয়ে পত্রিকার কভার পেজেই উল্লেখ করেন ‘তরুণ কবিদের মৃগয়া ভূমি’। কেউ ভালো লিখছেন বা ভালো লিখবেন এরকম সম্ভাবনা আছে তাকে তৎক্ষণাৎ চিঠি দিয়ে অথবা ফোন করে লেখা চেয়ে নিয়েছেন। কখনো গদ্য লিখিয়েছেন। কখনো গল্প লিখিয়েছেন। আবার কখনো সমালোচনা। ‘দৌড়ে’র পাশাপাশি দীর্ঘ কবিতার জন্য ‘হৃদয়পুর’ নামে আর একটি পত্রিকাও প্রকাশ করেছেন। যার প্রতিটি সংখ্যায় গুচ্ছ গুচ্ছ দীর্ঘ কবিতা প্রকাশিত হয়েছে। পত্রিকা সম্পাদনা করতে গিয়ে কোনও কোনও সময় এতই মগ্ন হয়ে পড়েছেন যে নাওয়া-খাওয়াও ভুলে গেছেন। পুরো বাড়িটিই পত্রিকাময় হয়ে গেছে। একের পরে এক আত্মীয়-স্বজনের মৃত্যু সহ্য করেও কবি ও বন্ধুদের চিঠি লিখতে ভোলেননি। নতুন কবিরা একবার লেখা পাঠালে এবং সেই লেখা পছন্দ না হলে তাদের দ্বিতীয়বারও পাঠাতে বলেছেন। কখনো সংশোধন করতে বলেছেন। তরুণ কবিদের উৎসাহ প্রদানের জন্য বছরে কখনো দুজন, কখনো একজনেরও প্রথম কাব্য নিজ খরচে প্রকাশ করেছেন। ‘দৌড়’ থেকে প্রকাশিত সেরা কাব্যগ্রন্থটিকে পুরস্কৃত করেছেন। আর এই পুরস্কার যে নগদ অর্থসহ তা বলাই বাহুল্য। তেমনি অন্য লিটিল ম্যাগাজিনকেও পুরস্কার প্রদান করেছেন কেবলমাত্র উৎসাহ প্রদানের জন্য। একদিকে তরুণ কবি এবং তরুণ সম্পাদকও মধুমঙ্গল বিশ্বাসের সৌজন্যে অভিভূত হয়েছেন। সাহিত্যগত প্রাণ এরকম একজন সম্পাদক বাংলা সাহিত্যে বিরল। কখনো এতোটুকু অহংকার দেখিনি। কখনো নিজের লেখা নিয়ে বড়াই করতে শুনিনি। বাৎসরিক বা মাসিক অনুষ্ঠানগুলোতে কখনো এতোটুকু বিরক্তি বোধ করেননি। দূর থেকে আগত আমাদের জন্য থাকার ও খাওয়ার সুব্যবস্থা করেছেন। তেমনি কখনো কখনো বাড়ি ফিরে যাবার খরচটুকুও যুগিয়েছেন। সেইসব দিনের কথা, সেইসব মুহূর্তগুলি আমরা অন্তত কয়েক জন কখনোই ভুলতে পারব না। তাঁর আয়োজিত অনুষ্ঠানে বহু বিদগ্ধ প্রাবন্ধিক-লেখক ও কবি উপস্থিত হয়েছেন। সকলকে সমমর্যাদায় সম্বোধন করেছেন। দিয়েছেন সম্মানও। আজও দারুণভাবে সেই কণ্ঠস্বর শুনতে পাই। সাহিত্য সাধনায় এরকম একজন মানুষের সঙ্গে পরিচিতি হওয়াও একটা সৌভাগ্যের ব্যাপার বলেই মনে করি। আজকের দিনের বহু সম্পাদক তাঁর কাছ থেকে শিক্ষা নিতে পারেন। না, আমি এরকম সম্পাদক আর দেখিনি।

তাঁর এই জন্মদিনে নিরন্তর শুভকামনায় আমার অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে শ্রদ্ধাটুকু জানালাম।

তৈমুর খান

(ছবিতে মধুমঙ্গল বিশ্বাস)

#StoryandArticle

--

--

বাংলা ভাষার সাহিত্য পত্রিকা । যে কোনো সময় লেখা পোস্ট করা যায় । ফেসবুক https://www.facebook.com/storyandarticle পত্রিকার লিঙ্ক https://storyandarticle.com

Love podcasts or audiobooks? Learn on the go with our new app.

Get the Medium app

A button that says 'Download on the App Store', and if clicked it will lead you to the iOS App store
A button that says 'Get it on, Google Play', and if clicked it will lead you to the Google Play store